প্রথমেই, এই হবিতে আপনাকে স্বাগতম। একদম প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত সবার যেসব প্রশ্ন থাকে সেগুলোরই উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। লেখার ফোকাস থাকবে ...
প্রথমেই, এই হবিতে আপনাকে স্বাগতম। একদম প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত সবার যেসব প্রশ্ন থাকে সেগুলোরই উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। লেখার ফোকাস থাকবে কি কি করবেন এবং কিভাবে করবেন তার ওপর। কেন করবেন সেই ব্যাপারে গ্রুপের ডক ফাইলগুলায় বিস্তারিত সবই আছে তাই এই লেখায় আর সেই ব্যখ্যায় যেতে চাচ্ছিনা। তো, চলুন শুরু করা যাক-
১. সেটাপের ধরন, মাছ নির্বাচন ও বাজেটঃ
সবার আগে ডিসিশন নিন কোন ধরনের মাছ রাখতে চাচ্ছেন এবং কেমন সেটাপ চাচ্ছেন। আপনার মাছের উপর নির্ভর করবে ট্যাংকের সেটাপ কেমন হবে। প্ল্যান্টেড ও হার্ডস্কেপ এই দুই ধরনের সেটাপ দিতে পারেন। এইখানে বাজেটের ব্যাপারও মাথায় রাখা লাগবে। বাজেট অনুযায়ী আপনার ট্যাংক সাইজ নির্ভর করবে। কথাগুলো কেন বলছি আশাকরি তা লেখা পুরোটা পড়ার শেষে তা পরিষ্কার হবে।
২. ট্যাংক কেনা/বানানো
কাঁটাবনে রেডিমেড ট্যাংক পাওয়া যায়। স্থানীয় একুরিয়ামের দোকানেও পাবেন। এইগুলার সুবিধা হচ্ছে গিয়েই কিনে নিয়ে আসা গেল দরদাম করে। সাইজ ভেদে দাম পড়বে ২০০-২০০০ টাকা, হুডসহ। কিন্তু অসুবিধা হলো কাচ অনেক পুরনো তাই ঘোলা, প্রয়োজনের তুলনায় চিকন গ্লাস দেয় তাই যেকোনো দিন হুড়মুড় করে ভেঙেচুড়ে পড়বে এবং দেখতেও খারাপ। তাই নতুন কাচে বানিয়ে নেয়াই সবচে ভালো। সেটা দেখতে ভালো হবে, কাচ হবে একদম পরিষ্কার এবং সবকিছু আপনার ইচ্ছামত কাস্টমাইজ করা যাবে। কাচের দোকান থেকে নাসির/ক্রিস্টাল কাচ এবং হার্ডওয়ারের দোকান থেকে সিলিকন আঠা কিনে একুরিয়ামের দোকানের লোকদের বললে ওরা বানিয়ে দিবে। ট্যাংকের সাইজের ওপর মজুরি নির্ভর করে। ১ ফুট থেকে ৩ ফুট ট্যাংকের মজুরি হবে ২০০-৫০০ টাকা।
আপনি চাইলে নিজেও বানিয়ে নিতে পারেন। সেইক্ষেত্রে ইউটিউব থেকে বেশ কয়েকটা ভিডিও কয়েকবার করে দেখে নেয়া ভালো। তবে ভালো ফিনিশিং চাইলে প্রফেশনালরাই বেটার চয়েস। কাচের দাম কেমন হবে ও ট্যাংক সাইজ অনুয়ায়ী কত টাকার কাঁচ লাগবে তা এইখানে পড়ুন।
ট্যাংকের সাইজের উপর গ্লাস থিকনেস ডিপেণ্ড করে। কত সাইজের ট্যাংকে কত মিলিমিটার গ্লাস দিবেন জানতে এই আর্টিকেলটা পড়ুন।
৩. স্ট্যান্ডঃ
কাঁটাবনে রেডিমেড+অর্ডারি দুই ধরনের কাঠের স্ট্যান্ডই পাবেন। আপনি নিজেও ফার্নিচারের দোকান থেকে বানিয়ে নিতে পারেন সেক্ষেত্রে অবশ্য খরচ বেশী পড়লেও টেকসই হবে বেশী। তাছাড়াও লোহার ওয়ার্কশপ থেকে আয়রন স্ট্যান্ড বানানো যায় যা অপেক্ষাকৃত কম দামের কিন্তু টেকসই হবে বেশী।
৪. ফিল্টারঃ
এরপর আপনাকে ফিল্টার কিনতে হবে। ফিল্টার কয়েক ধরনের আছে যেমন সাম্প ফিল্টার, ক্যানিস্টার ফিল্টার, টপ ফিল্টার, হ্যাং অন ব্যাক ফিল্টার, পাওয়ার ফিল্টার, স্পঞ্জ ফিল্টার ইত্যাদি। আপনার ট্যাংকের সাইজ অনুযায়ী ও মাছের ধরন অনুযায়ী ফিল্টার নির্ভর করবে। কাঁটাবনে দোকানদারেরা "ট্রে ফিল্টার বা আণ্ডারগ্রাভেল ফিল্টার" বলে যেটা ধরায়ে দেয় সেটা কেনা যাবেনা। ফিল্টারের সাথে ট্যাংক সাইক্লিং বিষয়টা জড়িত। এই ব্যাপারে সালমান খান ভাইয়ের এই লেখাটা পড়া আপনার জন্য আবশ্যক।
আর কত লিটার পানির জন্য কোন ফিল্টার লাগবে জানতে এটা পড়েন।
৫. ট্যাংকের ব্যাকগ্রাউন্ডঃ
ট্যাংকের পিছনের কাচের বাইরের দিকে আপনার পছন্দমত ব্ল্যাক, হোয়াইট বা স্কাই ব্লু স্প্রে পেইন্ট স্প্রে করতে পারেন। এতে ট্যাংকের ব্যাকগ্রাউন্ড আকর্ষণীয় হবে। স্প্রে করার সময় পিছনের কাচ বাদে বাকী কাচগুলা কাপড়/পেপার দিয়ে ঢেকে রাখবেন। স্প্রে না করতে চাইলে আঠা দিয়ে ব্ল্যাকপেপারও অ্যাটাচ করতে পারেন।
ট্যাংক সমতল জায়গায় বসাতে হবে। আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু স্থানে বসানো যাবেনা। আর ট্যাংকের নিচে অবশ্যই নিচের কাচের সমান মাপের কর্কশিট (Styrofoam) এর উপর বসাতে হবে।
৬. লাইটঃ
হার্ডস্কেপ ট্যাংকে শুধু দেখার মত আলো হলেই হয়। লো-টেক প্ল্যান্টেড ট্যাংকে প্রতি গ্যালন পানির জন্য ২-৩ ওয়াটা আলো লাগে এবং হাই টেক প্ল্যান্টেড ট্যাংকে গ্যালন প্রতি ৪-৫ ওয়াট আলো দরকার হয়। অল্প টাকায় কিভাবে লাইটিং সেটাপ করবেন তা জানতে আমার এই তিনটা লেখা পড়ে আসুন-
ক. স্টিক এলইডি নিয়ে
খ. বাল্ব এলইডি বা esl নিয়ে
গ. প্যানেল এলইডি নিয়ে
৭. সেটাপের আনুষঙ্গিক জিনিসপাতিঃ
সেটাপে কি কি লাগবে সেটা নির্ভর করছে প্ল্যান্টেড করছেন না হার্ডস্কেপ করছেন নাকি ফিশ ওনলি সেটাপ করছেন তার উপর। হার্ডস্কেপ সেটাপে সাবস্ট্রেটের সাথে লাগবে বগ অথবা রক বা দুইটাই। সাবস্ট্রেট হিসেবে হোয়াইট স্যান্ড, জিরো সাইজড ক্রাশড স্টোন বা সিলেট স্যান্ড দেয়া যায়। হোয়াইট স্যান্ড ও ক্রাশড স্টোন কাঁটাবনে ৩০-৭০ টাকা কেজিদরে পাওয়া যাবে। সিলেট স্যান্ড হলো কন্সট্রাকশনের কাজে যেই হলুদ বালু ব্যবহার করা হয় সেটা। সিলেট স্যান্ড ইট-বালু-সিমেন্টের দোকানে ৫০ কেজির এক বস্তা ৫০ টাকায় পাওয়া যাবে। বগ কিভাবে দ্রুততম সময়ে প্রসেস করবেন সেটা জানতে আমার এই লেখাটা পড়ুন।
হার্ডস্কেপ সেটাপ কিভাবে করবেন আইডিয়া পেতে Hardscape only aquariums লিখে গুগলে ইমেজ সার্চ দিন।
প্ল্যান্টেড করতে চাইলে কয়েকটা অপশন আছে। অল্প মেইন্টেনেন্সে স্যান্ডে প্ল্যান্টেড ট্যাংক করতে চাইলে আমার এই লেখাটা পড়ুন।
স্যান্ডে আবার সব প্ল্যান্টস হয়না কিছু লিমিটেড প্ল্যান্টস বাদে। সেক্ষেত্রে বেটার হচ্ছে গার্ডেন সয়েল দিয়ে প্ল্যান্টেড ট্যাংক করা। কিভাবে করবেন জানতে খালিদ আব্দুল্লাহ ভাইয়ের এই ভিডিওটি দেখুন-
তাছাড়াও কমার্শিয়াল সয়েল, প্রেশারাইজড সিওটু সিস্টেম দিয়ে হাই টেক প্ল্যান্টেড ট্যাংকও করা যায়। কমার্শিয়াল সয়েলে প্রায় সব ধরনের একুয়াটিক প্ল্যান্টসই হবে রিকোয়ারমেন্ট পূরণ করতে পারলে।
৮. সেটাপ দেয়ার পরবর্তী করণীয়ঃ
লিঙ্কের লেখাগুলো পড়ে ফেললে এতক্ষণে বুঝেই গেছেন কিভাবে সেটাপ দেবেন। সেটাপ দেয়ার পর ফিল্টার অন করে দিন। দিনরাত ২৪ ঘন্টা ও ৩৬৫ দিন ফিল্টার চলবে, বন্ধ করবেন না। প্রতিদিন অল্প করে ফিশ ফুড দিন ও নিয়মমত ওয়াটার চেঞ্জ করুন। কখনোই ১০০% পানি চেঞ্জ করবেন না সপ্তায় ৩০-৫০% পানি চেঞ্জ করবেন শুধু। ট্যাপের পানিতে ক্লোরিন থাকলে চেঞ্জের সময় অ্যান্টিক্লোরিন দিবেন (যেমন Azoo, Dr Aqua, White Crane ইত্যাদি ব্র্যাণ্ডের) অথবা এক সপ্তাহ পানি বালতি/ড্রামে জমিয়ে রেখে সেই পানিটা ব্যবহার করবেন। পানি চেঞ্জের কাজ সহজ করতে গার্ডেন হোশ পাইপ ব্যবহার করতে পারেন। লাইট দৈনিক ৮-১০ ঘন্টা জ্বালাবেন একটানা। সাইক্লিং কমপ্লিট হয়ে গেলে ৪ সপ্তাহ পরে আপনার কাঙ্ক্ষিত মাছ ছাড়বেন। সব মাছের সাথে সব মাছ রাখা যায়না। তাই কমেন্টে দেয়া ফিশ কম্প্যাটিবিলিটি চার্ট ফলো করে বা গুগল থেকে কম্প্যাটিবিলিটি চেক করে মাছ ছাড়বেন।
৯. কি কি করবেন নাঃ
ক. আপনি দোকানদারের কাছে মুরগী এবং তার টার্গেট ভুজুংভাজুং দিয়ে আপনার কাছে এটা-ওটা বিক্রি করা। দোকানদারের কথা শুনবেন না। অনেকেই প্রতারিত হয়ে পরে আফসোস করে তাই আগে থেকে সতর্ক হোন। কিছু কেনার আগে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে সবার কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলো।
খ. লাল, নীল, সাদা, হলুদ এই চার রঙের পানি কিনবেন না। এগুলা মেডিসিন বলে বিক্রি করে আসলে যাস্ট রঙ দেয়া পানি এবং ক্ষতিকর।
গ. নীল যে লবণ ওরা সামুদ্রিক লবণ বলে বিক্রি করে ওটাও কিনবেন না।
ঘ. জার কোন অবস্থাতেই মাছ রাখার জন্যে কিনবেন না। জারে মাছ বাঁচানো যায় না।
ঙ. মোজাইক যে পাথর কাঁটাবনে সাধারণত ধরায়ে দেয় সেগুলো সাবস্ট্রেট হিসেবে দেবেন না। কারণ বড় সাইজের বলে ভিতরে অনেক পকেট তৈরি হয় যেখানে মাছের ময়লা জমে এবং সাইফন করলেও তা দূর হয়না। ফলে পানির কোয়ালিটি খারাপ হতে থাকে।
চ. খেলনা জাতীয় যেই জিনিসগুলা ওরা ধরায়ে দেয় সেগুলা কিনবেন না কারণ কয়দিন পরেই আপনি সেগুলা ফেলে দিবেন যখন একুয়াস্কেপের টার্মটা ধরে ফেলবেন।
ঙ. হতাশাজনক হলেও সত্য, ইদানীং অনেকেই নতুনদের দেখলে বেশী দামে ট্যাংক/ফিশ বা অন্যান্য জিনিস বিক্রি করতে চায়। হেল্প পোস্ট আসলে এরা বলবে "I can help you, check inbox" এদের ব্যাপারে সতর্ক হোন। কিছু হুট করে কেনার আগে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে সবার মতামত জেনে নিন।
ছ. হুট করে গোল্ডফিশ কিনে ফেলবেন না। গোল্ডফিশ কেনার আগে এটা পড়ুন।
জ. এছাড়া ট্যাংকের রেগুলার মেন্টেনেন্স কীভাবে করবেন এখানে দেখুন।
এই হচ্ছে নতুনদের পক্ষ থেকে সাধারণত যা যা জানতে চাওয়া হয় সেগুলোর উত্তরগুলোর মোটামুটি একটা সমন্বিত রুপ। অনেক কথা লিখেছি, কিছু যদি ভুলে গিয়ে থাকি তো পরে অ্যাড করে দিবো।
আবারও প্রচন্ড ক্রিয়েটিভিটির এই হবিতে আপনাকে স্বাগতম।
© লেখক - শামসুন আরেফীন


COMMENTS